ছোটবেলায় পড়া গালিভার ট্রাভেলসের গল্প মনে আছে সবারই।গালিভার নামের এক পর্যটক ঘুরতে ঘুরতে পৌঁছেছিলেন এমন একদেশে যেখানে সকলেই ছিলেন বামন। সেখানে সাধারণ উচ্চতার কোনো মানুষ ছিলেন না। সেই লিলিপুটদের দেশ যে শুধুমাত্র গালিভারের গল্প নয়, বাস্তবে তা ছিল; সেকথা অনেক পরে জানা যায়। ইরান-আফগানিস্তান সীমান্ত ঘেঁষা দক্ষিণ খোরাসান প্রদেশের একটি গ্রাম মাখুনিক ছিল সেই লিলিপুটদের গ্রাম।কয়েকশ বছর আগে তারা সেখানে এসে বসবাস করতো। তাঁদের অধিকাংশই উচ্চতায় এক মিটারের বেশি লম্বা ছিল না।
কেবল অতীতের ইরান নয়, চিনেও রয়েছে বামনদের গ্রাম। সেই গ্রামেও থাকেন খুব ছোট ছোট মানুষ। যাদের ছোট ছোট হাত-পা।ছোট ছোট ঘর-দোর। সবই ছোট ছোট। জায়গাটি যেন রূপকথার পাতা থেকে উঠে আসা। ছবির মতো সুন্দর সেই গ্রাম। ছিমছাম চারপাশ, দোকানপাট, যানবাহন-সহ দৈনন্দিন জীবনের প্রয়োজনীয় সবকিছু আছে সেখানে। যেন একটা পুতুলদের গ্রাম।
এমন গ্রাম কেবলমাত্র কল্পকাহিনিতেই সম্ভব। কিন্তু বাস্তবে রয়েছে সেই গ্রাম। আর পাঁচটা গ্রামের চাইতে অনেকটা আলাদা। সেই গ্রামটিতে বাস করে কেবল বামনেরাই। চিনের ওই গ্রামের নাম ডোয়ার্ফ ভিলেজ বা বামন গ্রাম।

ওই গ্রামটি ঠিক অন্য সব গ্রামের মতো করে গড়ে ওঠেনি। হওয়ার কথাও ছিল না। প্রথম দিকে একটা থিম পার্ক হিসেবে গ্রামটিকে গড়ে তোলা হয়। যেখানে পার্কটির মালিক বেশকিছু বামন মানুষকে চাকরি দেন, থাকার জায়গা দেন। তারপর থেকে বামনরা সেখানে থাকতে শুরু করে।
বামনদের গ্রাম বলে পরিচিত গ্রামটিতে অনেক মানুষ বেড়াতে আসে। গ্রামের বামনরা পর্যটকদের মনোরঞ্জন করেই নিজেদের অন্ন-সংস্থান করেন। এখন মনোরঞ্জনের দিকটা থাকলেও ওই পার্কে বসবাসকারি মানুষেরা হয়ে গিয়েছে একে অন্যের আত্মীয়ের মতোই। অনেকেই ওই পার্কটিকে নিয়ে মানবাধিকার লঙ্ঘনের কথা তুললেও ওই এলাকাটিতে বসবাসকারি হাজারের বেশি বামন নিজেদের মতো করে ভালই আছেন।
ডোয়ার্ফ ভিলেজ থিম পার্ক-এর ভাবনায় তৈরি হলেও চিনের শিচুয়ার প্রদেশে রয়েছে আরেকটি বামন গ্রাম যেটি মানুষ নয়, তৈরি করেছে প্রকৃতি। ইয়াংশি নামের ওই গ্রামটি যুগের পর যুগ ধরে রয়েছে মানুষের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে। বিশেষ করে বিজ্ঞানীদের আগ্রহ সবচেয়ে বেশি। কারণ দক্ষিণ-পূর্ব চিনের ওই গ্রামটিতে ৪০ শতাংশ মানুষ বামন। সবচাইতে লম্বা মানুষটির উচ্চতা মাত্র ৩ ফিট ১০ ইঞ্চি। আর সবচেয়ে ছোট্ট মানুষটি ২ ফুট ১ ইঞ্চির।

বিজ্ঞানীদের গবেষণার বিষয় এখানে কেন এমনটা হয়েছে এবং এখনো হয়ে চলেছে? অনেক গবেষণার পরেও আজ পর্যন্ত রহস্য উদঘাটন সেভাবে করা যায়নি। গ্রামের বয়স্কদের কথা অনুযায়ী, গবেষণায় নতুন কিছু মিলবে না। তাদের মতে, অনেক অনেক বছর আগে হঠাৎ করে এই গ্রামেএকবার এক ভয়াবহ রোগ হানা দিয়েছিল। সেই সময় সেই রোগের প্রকপে ৫ থেকে ৭ বছর বয়সী ছেলেমেয়েদের বৃদ্ধি থেমে যায়। অর্থাৎ তারা বেঁটে থেকে যায়। সেই শুরু। তারপর থেকে এখন পর্যন্ত সেই রোগের হাত থেকে এই গ্রামের মানুষ মুক্তি পায়নি।

একের পর এক বামন শিশু জন্ম নিচ্ছে গ্রামে তার পেছনে রয়েছে সেই অজানা রোগেরই হাত। বিজ্ঞানীরাইয়াংশিতে গিয়ে বেশ কয়েকবার সেখানকার মাটি, জল, শস্য পরীক্ষা করে দেখেছেন। পরীক্ষা করেছেন সেখানকার মানুষদেরও। তবে হাজার চেষ্টা করেও এখন পর্যন্ত সেই রহস্যের কূলকিনারা পাওয়া যায়নি।
ইয়াংশির মতো বামনদের গ্রাম রয়েছে বাংলা আর ভুটান সীমান্ত ঘেঁষা উদালওড়ি-তে। টংলা বাজার থেকে এক কিলোমিটার দূরে ওই গ্রামটিকে সবাই চেনে-জানে ‘বামনদের গ্রাম’ বলে। কারণ এখানে বসবাসকারি সবাই বামন। স্বাভাবিক উচ্চতার মানুষদের তাচ্ছিল্য আর বিদ্রুপের হাত থেকে বাঁচতে বামনরা এই গ্রাম তৈরি করেছেন। এই গ্রামের মানুষগুলির উচ্চতা ৩ ফুটের বেশি নয়। তবে এই গ্রামের আরও একটা বড় পরিচয় গ্রামটি নাটকের গ্রাম।
২০০৩ সালে দিল্লির ন্যাশনাল স্কুল অফ ড্রামা থেকে পড়া শেষ করে টংলায় নিজের প্রত্যন্ত গ্রামে ফেরা পবিত্র বামনদের প্রতি সমাজের অবহেলা দেখে মর্মাহত হয়ে বামনদের নিয়ে গড়েছিলেন নাটকের দল দাপোন-এ (দর্পণ)। ২০০৮ সালে তাদের নিয়ে করেন নাটকের কর্মশালা। পরে ২৩ জন বামন ও সিদ্ধার্থ মুখোপাধ্যায়কে নিয়ে মঞ্চস্থ করেন নাটক ‘কিনো কঁও’।সেই নাটক উদালওড়ি ছাড়িয়ে পাড়ি জমিয়েছে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে। স্বাভাবিক উচ্চতারদর্শকদের চেতনায় চাবুক মেরেছে সজোরে।
1 Comment
দারুণ একটা বিষয় জানা হল। বামনদেরও একটা নিজস্ব গ্রাম; ওরা আমাদের কাছে ঠাট্টা আর বিদ্রুপের পাত্র, ওদের সম্পর্কে এত কথা আগে পাই নি।